1. faysal.rakib2020@gmail.com : admin :
  2. thelabpoint2022@gmail.com : Rifat Hossain : Rifat Hossain
মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংকট, রাষ্ট্রের করণীয় এবং সময়ের দাবি। - বাংলার কন্ঠস্বর ।। Banglar Konthosor
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৯ অপরাহ্ন
নোটিশ :
বিভিন্ন জেলা,উপজেলা-থানা,পৈারসভা,কলেজ পর্যায় সংবাদকর্মী আবশ্যক । 01711073884

মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংকট, রাষ্ট্রের করণীয় এবং সময়ের দাবি।

  • প্রকাশিত : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
  • ১৮৩ 0 বার সংবাদি দেখেছে

মো. গোলাম রসুল স্বপন।। 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে করোনা, ডেঙ্গু, হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় যাঁরা নীরবে সামনের সারিতে কাজ করেন, তাঁদের অন্যতম মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। অথচ স্বাস্থ্যসেবার এই অপরিহার্য পেশাজীবী গোষ্ঠী আজও নীতিগত অগ্রাধিকার, কর্মসংস্থান, পদমর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেননি। আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়েও তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের ৭০ শতাংশেরও বেশি সিদ্ধান্ত পরীক্ষাগারের ফলাফল, মেডিকেল ইমেজিং এবং অন্যান্য ডায়াগনস্টিক সেবার ওপর নির্ভরশীল—এটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। এসব পরীক্ষা সম্পাদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ভুল ফল নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব পালন করেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। একজন চিকিৎসকের সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনার পেছনে তাই একজন দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোভিড-১৯ মহামারি এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। যখন পুরো দেশ অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে ছিল, তখন চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা প্রতিদিন হাজার হাজার নমুনা পরীক্ষা করে রোগ শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংক্রামক রোগজীবাণুর সংস্পর্শে থেকেও তাঁরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সচল রেখেছেন। কিন্তু মহামারির সেই অবদানের তুলনায় এই পেশার কাঠামোগত সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) Health Systems in Transition: Bangladesh প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টের অনুপাত ছিল প্রায় ১ : ০.৪ : ০.২৪। একই প্রতিবেদনে WHO-এর সুপারিশকৃত ১ : ৩ : ৫ স্কিল-মিক্সের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন টেকনোলজিস্টকে একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়। এই তথ্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে বাংলাদেশে বিশেষ করে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ঘাটতি এখনো উল্লেখযোগ্য।

WHO এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রণীত Bangladesh Health Workforce Strategy এবং WHO-সমর্থিত স্বাস্থ্যকর্মী মূল্যায়নেও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, স্কিল-মিক্সের ভারসাম্যহীনতা, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, জনবলের সুষম বণ্টন এবং গ্রাম-শহরের বৈষম্যকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রতিবছর সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হাজারো শিক্ষার্থী মেডিকেল টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা ও বিএসসি সম্পন্ন করলেও তাঁদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকেন। প্রয়োজনের তুলনায় নিয়োগ সীমিত, নতুন পদ সৃষ্টি ধীরগতির এবং জনবল পরিকল্পনা বাস্তব চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে একদিকে দক্ষ জনবলের ঘাটতি, অন্যদিকে প্রশিক্ষিত জনশক্তির বেকারত্ব—এই দ্বৈত সংকট স্বাস্থ্যখাতের জন্য উদ্বেগজনক।

বেতন ও পদমর্যাদার বিষয়েও দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৌশল ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতের কিছু ডিপ্লোমাধারী সরকারি পেশাজীবী উচ্চতর গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত হলেও মেডিকেল ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্টদের ক্ষেত্রে একই ধরনের সুযোগ এখনো নিশ্চিত হয়নি। একইভাবে বিএসসি মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য পৃথক উচ্চতর পদ বা সুস্পষ্ট পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরও অনেকেই তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের সমস্যাও সমান গুরুত্বের দাবিদার। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা ও পেশাগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁরা দক্ষতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পান না। এর ফলে রাষ্ট্রের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দক্ষ মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতেও অনেক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সীমিত বেতন, অনিশ্চিত চাকরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং পর্যাপ্ত পেশাগত সুরক্ষার অভাবে কাজ করেন। দক্ষ জনবল ধরে রাখতে ন্যূনতম বেতন কাঠামো, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নীতিমালা এবং Bangladesh Health Workforce Strategy 2024-এও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী পরিকল্পনা, জনবল উন্নয়ন, সঠিক পদায়ন এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এসব নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের শিক্ষা ও পেশাগত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে পেশাজীবীরা একটি স্বতন্ত্র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট শিক্ষা বোর্ড এবং পেশাগত কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, এমন একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষা, কারিকুলাম, নিবন্ধন, পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণ, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও নৈতিক মানদণ্ড আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ যখন ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Coverage) অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন শুধু হাসপাতাল নির্মাণ বা আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করাই যথেষ্ট নয়। সেই যন্ত্র পরিচালনা, পরীক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং রোগ নির্ণয়ে নির্ভুলতা আনতে দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অপরিহার্য।

এখন সময় এসেছে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের। প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি, নিয়মিত ও স্বচ্ছ নিয়োগ, মেডিকেল ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্টদের যৌক্তিক বেতন গ্রেড নির্ধারণ, বিএসসি মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য উচ্চতর পদ বা পৃথক ক্যারিয়ার কাঠামো পর্যালোচনা, ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের কর্মপরিধি সম্প্রসারণ, বেসরকারি খাতে ন্যূনতম বেতন কাঠামো এবং ধারাবাহিক পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনোই একক কোনো পেশার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সমন্বিত প্রচেষ্টাই একটি আধুনিক, নিরাপদ ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি।

মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের যথাযথ মূল্যায়ন কোনো একক পেশার দাবি নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, রোগীর নিরাপদ চিকিৎসা এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে একটি জাতীয় প্রয়োজন। আজ যদি দক্ষ মানবসম্পদকে যথাযথ মর্যাদা, সুযোগ ও ন্যায্য মূল্যায়ন দেওয়া যায়, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। স্বাস্থ্যসেবার এই নীরব যোদ্ধাদের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করা তাই শুধু ন্যায়সংগতই নয়, জাতীয় স্বার্থেও অপরিহার্য।

 

লেখক: মো. গোলাম রসুল স্বপন
সিনিয়র সহ-সভাপতি,
বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যালায়েন্স (বিএমটিএ)

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Comments are closed.

‍এই ক্যাটাগরির ‍আরো সংবাদ
Theme Customized By BreakingNews