
ফয়সাল রাকিব ।।
পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় কুয়াকাটাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে সরকারের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় ‘কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল ২০২৬’। ২৩ ও ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এ আয়োজন ঘিরে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মধ্যে ছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। তবে হোটেলভাড়া, খাবারের দাম এবং স্থানীয় পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর অভিযোগে সরকারের এই মহতী উদ্যোগের সফলতা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত কুয়াকাটা দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগ থাকায় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এ সৈকতের রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর পর বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই কার্নিভালের অন্যতম লক্ষ্য ছিল কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরা এবং পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ বাড়ানো।
কার্নিভালকে কেন্দ্র করে হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য এটি ছিল নিজেদের সেবার মান তুলে ধরার বড় সুযোগ। পর্যটকদের মানসম্মত সেবা, যুক্তিসংগত মূল্য এবং আন্তরিক আতিথেয়তার মাধ্যমে কুয়াকাটার প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা সম্ভব ছিল। এতে এককালীন ব্যবসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে পর্যটক আগমন ও আয় বৃদ্ধির পথও তৈরি হতে পারত।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার না করে অনেক ব্যবসায়ী কার্নিভালকে স্বল্পমেয়াদি বাড়তি আয়ের উপলক্ষ হিসেবে দেখেছেন। পর্যটকদের অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় কিছু হোটেলে কক্ষভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার প্রচার চালানো হলেও বাড়তি মূল্যের কারণে সেই ছাড়ের প্রকৃত সুফল নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একইভাবে অটো ও ভ্যানের ভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় তিন গুণ এবং খাবারের দাম দ্বিগুণ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব কারনে পর্যটকদের ভ্রমণব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি কুয়াকাটার পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
পর্যটনশিল্পের মূল শক্তি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিরাপদ পরিবেশ, সাশ্রয়ী ভ্রমণ, মানসম্মত আবাসন, খাবারের ন্যায্য মূল্য এবং পর্যটকদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ। একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে সাময়িকভাবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।
কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে শুধু সরকারি ভাবে কার্নিভাল আয়োজন কিংবা প্রচার-প্রচারণাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ, সেবার মান উন্নয়ন এবং পর্যটকদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর তদারকি। বিশেষ করে উৎসব ও ছুটির সময়ে হোটেলভাড়া, পরিবহন ও খাবারের মান ও দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি।
সরকারের উদ্যোগকে সফল করতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও বুঝতে হবে, পর্যটক এক দিনের ক্রেতা নন; তাঁরা কুয়াকাটার ভবিষ্যৎ পর্যটন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন পর্যটক ভালো অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলে তিনি আবার আসতে পারেন, অন্যদেরও আসতে উৎসাহিত করতে পারেন। বিপরীতে, অতিরিক্ত ভাড়া ও উচ্চমূল্যের অভিজ্ঞতা তাঁকে কুয়াকাটা সম্পর্কে বিরূপ ধারণা দিতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কুয়াকাটাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা কি শুধু দুই দিনের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর মাধ্যমে গড়ে উঠবে পর্যটকবান্ধব পরিবেশ?
পর্যটন কার্নিভাল ২০২৬ কুয়াকাটার জন্য একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে সেই সুযোগ কতটা কাজে লেগেছে, তা নির্ধারণে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা, সেবার মান এবং আয়োজনের পরবর্তী প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সরকারের মহতী উদ্যোগের পূর্ণ সফলতা নিশ্চিত করতে এখন প্রয়োজন প্রচারের পাশাপাশি বাস্তব সেবার উন্নয়ন, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং পর্যটকদের আস্থা অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ।