
নিজস্ব প্রতিবেদক // বন্ধুত্বের বন্ধনকে মানবিকতার শক্তিতে রূপ দিয়ে অসহায়, দুস্থ, নিম্নআয়ের মানুষ ও প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়িয়েছে ‘৮৪ ইভেন্ট গ্রুপ’। সংগঠনটির উদ্যোগ ও সদস্যদের ব্যক্তিগত সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত দেশের ৩৫৬টি পরিবার স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কাউকে দেওয়া হয়েছে রিকশা, কাউকে সেলাই মেশিন, কাউকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, আবার কাউকে দেওয়া হয়েছে আর্থিক সহায়তা।
পাশাপাশি বিভিন্ন মহামারির সময় খাদ্য ও অর্থ সহায়তা, ঈদে জাকাত ও পোশাক, শীতবস্ত্র বিতরণ, বর্ষাকালে রেইনকোট এবং বিভিন্ন এলাকায় টিউবওয়েল স্থাপনের মতো নানা মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি।
শুধু এককালীন সহায়তা নয়, অসহায় মানুষকে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলাই সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য। এ পর্যন্ত বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রায় ২৬ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছেন ৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের সদস্যরা।
২০২৩ সালে মাত্র ৩২ জন সদস্য নিয়ে ‘৮৪ ইভেন্ট গ্রুপ’র কার্যক্রম শুরু হয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ জনে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী এবং বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, প্রবাসী ও আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। সংগঠনের সদস্যরা প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা করে জমা দেন। সেই অর্থ এবং সদস্যদের অতিরিক্ত সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালিত হয় মানবিক কার্যক্রম।
৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের উদ্যোক্তা ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বরিশালের অধ্যক্ষ সাজ্জাদ পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা বন্ধুত্বের জায়গা থেকে সংগঠনটি শুরু করেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের মনে হয়েছে, এই বন্ধুত্বের শক্তিকে যদি মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যায়, তাহলে অনেক পরিবারের জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব। সে চিন্তা থেকেই আমরা অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষ খুঁজে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করে আসছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু কাউকে টাকা দিয়ে সাহায্য করা নয়, বরং সম্ভব হলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তাকে স্বাবলম্বী করে তোলা।’
তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ৩৫৬টি পরিবারকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করেছি। রিকশা, সেলাই মেশিন, দোকানের ব্যবস্থা, আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
গ্রুপের সদস্য আমেরিকা প্রবাসী শওকত মির্জা বলেন, ‘আমি দেশের বাইরে থাকলেও মনটা সবসময় দেশের মানুষের সঙ্গে জড়িত। ৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। আমাদের কাছে এটি শুধু একটি সংগঠন নয়, বরং বন্ধুদের এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে একজন অসহায় মানুষের কষ্টের কথা শুনলে সবাই মিলে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, সাহায্য পাওয়া মানুষটি যেন ভবিষ্যতে অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল না থাকেন। তাই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার ওপর আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিই। একজন মানুষকে কাজের সুযোগ করে দিতে পারলে তার পুরো পরিবার উপকৃত হয়।’
গ্রুপের আরেক সদস্য ভোলার ইঞ্জিনিয়ার শাহাদাত বলেন, ‘মানুষকে সাময়িক সহযোগিতা করা যেমন জরুরি, তেমনি তাকে আয়ের একটি স্থায়ী পথ তৈরি করে দেওয়াও জরুরি। এ কারণেই আমরা অনেক উপকারভোগীকে রিকশা, সেলাই মেশিন কিংবা ছোট ব্যবসার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এখন তারা নিজেরাই উপার্জন করছেন এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করছেন। এটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য।’
৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের সহায়তা পাওয়া ফাতেমা বলেন, ‘করোনার সময় আমার স্বামী চাকরি হারান। তখন আমাদের সংসারে খুব কষ্টের সময় নেমে আসে। কীভাবে সংসার চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। পরে ৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের বন্ধুরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে আর্থিক সহযোগিতা করেন। সেই সহযোগিতা পুঁজি করে আমি কাজ শুরু করার সুযোগ পাই। বর্তমানে বরিশাল সার্কিট হাউসের সামনে একটি ভাতের হোটেল পরিচালনা করছি। আল্লাহর রহমতে এখন ভালোভাবেই সংসার চালাতে পারছি। তাদের সহযোগিতা না পেলে হয়ত এতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারতাম না।’

চাকরি হারিয়ে রিকশা পেয়ে স্বাবলম্বী লাল মিয়া বলেন, ‘বয়স বেশি হয়ে যাওয়ার কারণে সিটি করপোরেশনের চাকরিটি চলে যায়। তখন হঠাৎ করেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই সময় ৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের বন্ধুরা আমার পাশে দাঁড়িয়ে একটি নতুন রিকশা দেন। এখন প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে যে আয় করি, তা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভালোভাবেই চলছি। আমার মতো একজন মানুষের হাতে তারা শুধু একটি রিকশা তুলে দেননি, বরং আবার কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।’
পার্কে বসে ফুল বিক্রি থেকে নতুন জীবন শুরু করা আমেনা বলেন, ‘আগে অর্থের অভাবে নগরীর ব্যালেন্স পার্কে ফুল বিক্রি করতাম। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, পরিবারের অভাবের কারণে নানা চিন্তায় থাকতে হতো। ৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের সদস্যরা আমার বিষয়টি জানতে পেরে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা আমার স্কুলে পড়ালেখার ব্যবস্থা করেছেন, নতুন স্কুল ড্রেস কিনে দিয়েছেন এবং আমার শিক্ষার দায়িত্বও তারা নিয়েছেন। এখন আর আমাকে ফুল বিক্রি করতে হয় না, এখন মনে হয়, আমিও একদিন পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব।’
৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘আমার চাকরি জীবনের শুরু থেকে থেকে অসহায় ও দুস্থ মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী পাশে দাঁড়িয়ে আসছি। এই ৮৪ ইভেন্ট গ্রুপের মাধ্যমে আরও বড় পরিসরে মানুষের সহায়তা করার সুযোগ হয়েছে। এখন কোনো অসহায় ও দুস্থ মানুষের খোঁজ পেলে আগে তার সম্পর্কে খোঁজ খবর নেই। পরে তার প্রয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে সহায়তার ধরন নির্ধারণ করা হয়।’
তার দেওয়া তথ্যমতে, সদস্যদের মাসিক এক হাজার টাকা করে সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ২৬ লাখ টাকা বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কাজে ব্যয় করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রিকশা, সেলাই মেশিন, দোকান, কর্মসংস্থান ও আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ১০টি জেলার বিভিন্ন প্রান্তের ৩৫৬টি পরিবারকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।