
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি // দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন উপকূলবর্তী জনপদ বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায় কলা চাষ এখন কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। একবার চারা রোপণ করেই টানা ২৪ মাসে তিনবার পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হলেও লাভের পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে চিংড়ি চাষের পাশাপাশি কলা চাষও এখন মোরেলগঞ্জ তথা বাগেরহাটের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই লাভজনক কৃষির ওপর নির্ভর করেই অনেক কৃষক দারিদ্র্য কাটিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
উপজেলার চিংড়াখালী, রামচন্দ্রপুর, বনগ্রাম ও হোগলাপাশা ইউনিয়নে প্রতিবছরই বাড়ছে কলার আবাদ। অনুকূল মাটি, উপযোগী আবহাওয়া এবং সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এ অঞ্চলের উৎপাদিত কলা স্বাদ, গুণগত মান ও বাজারমূল্যের দিক থেকে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহও ক্রমাগত বাড়ছে।
বর্তমানে মোরেলগঞ্জে কলা চাষ, সংগ্রহ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রতিদিন ট্রাকযোগে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে মোরেলগঞ্জের কলা। উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হওয়ায় কৃষকরাও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।
ঢাকার কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আনোয়ার পারভেজ বলেন, “মোরেলগঞ্জের কলা অত্যন্ত সুস্বাদু ও মানসম্মত। ঢাকার বাজারে এর আলাদা চাহিদা রয়েছে। অনেক আড়তদার ও ফড়িয়া বিশেষভাবে মোরেলগঞ্জের কলার খোঁজ করেন। এখন ‘মোরেলগঞ্জের কলা’ ঢাকার বাজারে একটি পরিচিত ব্র্যান্ড। আমি প্রতি সপ্তাহে তিন থেকে চার ট্রাক কলা ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করি।”
কলাচাষি হামিদুল কাজী বলেন, “কলা চাষে রোগবালাই তুলনামূলক কম। নিয়মিত পরিচর্যা করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে ঝড়-ঝঞ্ঝা হলে কলাগাছ ভেঙে গিয়ে কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।”
বনগ্রাম ইউনিয়নের সফল কৃষক আতাউর রহমান জানান, প্রথমে এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে কলা চাষ শুরু করেছিলেন। ভালো লাভ হওয়ায় পরে আরও দুই বিঘা জমিতে কলার আবাদ বাড়ান। বর্তমানে প্রতিবছর নিয়মিত কলা চাষ করে তিনি লাভবান হচ্ছেন এবং অন্য কৃষকদেরও এ চাষে উৎসাহিত করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বাগেরহাট জেলায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে কলার আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৫০ হেক্টর বেশি। কৃষি বিভাগের ধারণা, আগামী মৌসুমে এ আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোতাহার হোসেন বলেন, “কলা চাষ লাভজনক হওয়ায় মোরেলগঞ্জের কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এ অঞ্চলে অনুপম, সাগর, সবরি, আনাজি ও চিনি চাম্পাসহ বিভিন্ন জাতের কলার চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগ রান্নার উপযোগী উন্নত জাতের ‘জি-নাইন’ কাঁচকলার চারা সরবরাহ এবং এর চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে।”
তিনি আরও বলেন, “কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে একই জমিতে টানা দুই বা তিন বছরের বেশি সময় কলা চাষ না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা হ্রাসের ঝুঁকি থাকে। তাই দুই বছর কলা চাষের পর এক মৌসুম অন্য সবজি বা ফসল আবাদ করে পুনরায় কলা চাষ করলে জমির উর্বরতা বজায় থাকে এবং ফলনও ভালো হয়।”
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, উন্নত জাতের চারা, সহজ বাজারজাতকরণ এবং কৃষকদের ক্রমবর্ধমান অভিজ্ঞতার কারণে মোরেলগঞ্জে কলা চাষের সম্ভাবনা দিন দিন উজ্জ্বল হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে এ খাতের আরও সম্প্রসারণ ঘটানো গেলে বাগেরহাটের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে মোরেলগঞ্জের কলা আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।