
একদিকে সুন্দরবন, অন্যদিকে নোনা জল—মাঝখানে মানুষের বসতি। প্রতিদিনের জীবন যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক অসম লড়াই। কখনো বাঘ-কুমিরের ভয়, কখনো নদীভাঙন; আবার কখনো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত।
বাড়ছে লবণাক্ততা, কমছে কৃষিজমি, বাড়ছে অনাবাদি জমি। তীব্র হচ্ছে সুপেয় পানির সংকট। জীবিকার নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু সেখানেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই। নানা প্রতারণার শিকার হয়ে অনেককে আবার ফিরতে হচ্ছে নিজ ভিটায়।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা থেকে খুলনা ও সাতক্ষীরা উপকূল—বিশেষ করে শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদগুলোতে এমন বাস্তবতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রকৃতিনির্ভর মানুষ বছরের একটি বড় সময় বন ও নদীকেন্দ্রিক কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। অথচ তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষের জীবন এই সংকটের কাছের উদাহরণ। সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও প্রান্তিক কৃষকরা নিষেধাজ্ঞার সময় আয় হারান। পরিবারপ্রতি সীমিত সরকারি সহায়তা মিললেও তা দিয়ে দীর্ঘ সময়ের সংসার চালানো কঠিন।
রাতের অন্ধকারে কোনো মা বা শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে জরুরি চিকিৎসা ও যাতায়াতের সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
যতীন্দ্রনগর জেলেপাড়ার সুরমা (ছদ্মনাম) সেই অনিশ্চিত জীবনেরই একজন প্রতিনিধি। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছ-কাঁকড়া ধরে সংসার চালান। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বনে যাওয়া শুরু করেছিলেন সুরমা। এখন স্বামীর হাত ধরে একই জীবিকার পথে হাঁটছেন।
কিন্তু এই পথেরও সীমা আছে।
নিষেধাজ্ঞার সময় বন ও নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরার সুযোগ থাকে না। তখন সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয় পরিবারগুলোকে। কিন্তু অল্প কিছু চাল দিয়ে পুরো পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় মেটানো সম্ভব হয় না। সুরমার নিজের কোনো সঞ্চয় নেই। তাই জীবিকার বিকল্প পথ খুঁজছেন তিনি।
জোয়ারের সঙ্গে যাদের জীবন দোলে, ঢেউয়ের সঙ্গে যাদের প্রতিদিনের হিসাব—তাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের বৈজ্ঞানিক শব্দ নয়। এটি তাদের হাঁড়িতে, ঘরে, জমিতে, পানির কলসিতে এবং সন্তানের ভবিষ্যতে প্রতিদিনের বাস্তবতা।
জলবায়ু পরিবর্তনের বড় অভিঘাতগুলোর একটি পড়ছে কৃষিতে। উপকূলের অনেক এলাকায় নদী ও জলোচ্ছ্বাসের লবণ পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়েছে। ফলে অনেক জমিতে আগের মতো ধান, সবজি বা অন্যান্য ফসল উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের একটি অংশ লবণসহিষ্ণু ধানের জাত ও অন্যান্য অভিযোজনযোগ্য ফসল চাষের চেষ্টা করছেন। তবে জমির লবণাক্ততা, সেচের পানির সংকট এবং মৎস্যঘেরে লবণ পানি প্রবেশের অভিযোগ তাদের সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাগেরহাট ও রামপালের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোথাও কোথাও কৃষিজমিতে মাছের ঘের সম্প্রসারণের কারণে লবণ পানি প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, ধান কাটার আগেই ঘেরে পানি ঢোকানো হলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার কোথাও খালে বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট মৎস্যচাষিদের বক্তব্য নিয়ে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ উপকূলে কৃষি ও মৎস্য—দুই খাতই মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উপকূলের মানুষের আরেকটি বড় সংকট সুপেয় পানি। অনেক এলাকায় পুকুর, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির উৎস সীমিত হয়ে পড়েছে।
এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয় নারীদের। অনেক পরিবারে নারীদের দূরবর্তী স্থান থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে ত্বকের সমস্যা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে।
ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। বাঁধ ভেঙে লবণ পানি ঢুকে পড়লে পুকুর ও অন্যান্য মিঠা পানির উৎস দূষিত হয়ে যায়। তখন নিরাপদ পানি সংগ্রহ হয়ে ওঠে পরিবারের অন্যতম প্রধান চিন্তা।
উপকূলীয় মানুষের কাছে সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস ও রিমাল শুধু ঘূর্ণিঝড়ের নাম নয়—প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাঙা ঘর, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ, নোনা পানি, হারানো ফসল, গবাদিপশু এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ।
ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যুক্ত হওয়ায় উপকূলীয় মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ও কমে আসছে। একটি দুর্যোগের ক্ষত শুকানোর আগেই আরেকটি দুর্যোগ নতুন ক্ষত তৈরি করছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এই অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয়। এটি শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার চাপ, নদীভাঙন এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন চাপ এই প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উপকূলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পানি, জীববৈচিত্র্য, অভিবাসন ও নগরজীবন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কিন্তু পরিকল্পনার সুফল বাস্তবে পৌঁছাতে হবে নদীর পাড়ের সেই পরিবারটির কাছে, যে পরিবার প্রতিদিন নোনা পানির সঙ্গে লড়াই করছে।
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি উপকূলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জেলে মাছ ধরেন, মৌয়াল মধু সংগ্রহ করেন, বাওয়ালি বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করেন—অসংখ্য পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বন ও এর জলাভূমির সঙ্গে যুক্ত।
দুর্যোগের সময়ও সুন্দরবন উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে। তাই সুন্দরবনকে রক্ষা করা মানে শুধু বাঘ, হরিণ, কুমির বা পাখিকে রক্ষা করা নয়; উপকূলের মানুষের ভবিষ্যৎকেও সুরক্ষিত করা।
উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের সম্প্রসারণ, কৃষকদের মানসম্মত বীজ ও প্রযুক্তি সহায়তা, নদী-খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের টেকসই সংস্কার জরুরি।
একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির আধার ও কমিউনিটি রিজার্ভার গড়ে তুলতে হবে। পুকুর পুনঃখনন, পানি সংরক্ষণ এবং ঘরে ঘরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থাও বাড়ানো প্রয়োজন।
কৃষির পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, মৎস্যসম্পদ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মতো বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময় শুধু খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না রেখে জেলেদের দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য উঁচু ভিত্তির ঘর, কার্যকর সাইক্লোন শেল্টার, দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা এবং উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তার জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সুন্দরবন উপকূলের মানুষের গল্প মূলত টিকে থাকার গল্প। তারা বারবার ঘর হারিয়েছেন, জমি হারিয়েছেন, জীবিকা হারিয়েছেন; তবুও ফিরে এসেছেন নদীর পাড়ে, বনের কাছে, নিজের ভিটায়।
কিন্তু প্রশ্ন এখন একটাই—আর কতদিন?
যে মানুষটি বছরের পর বছর নোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে একটি ছোট্ট ঘর টিকিয়ে রেখেছেন, তাকে শুধু ত্রাণ দিলে হবে না। তাকে নিরাপদ পানি দিতে হবে, কৃষির সুযোগ দিতে হবে, বিকল্প কর্মসংস্থান দিতে হবে, চিকিৎসা দিতে হবে এবং দুর্যোগের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দিতে হবে।
সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে মানুষের জন্য, আবার মানুষকেও বাঁচাতে হবে সুন্দরবনের জন্য। কারণ এই বন ও উপকূলের মানুষ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—তারা একই জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থার অংশ।
আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের উপকূল কেমন হবে—নোনা পানির অনিশ্চিত জনপদ, নাকি নিরাপদ, উৎপাদনশীল ও টেকসই এক উপকূল?