
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
একসময় গ্রামের ঝোপঝাড়, পতিত জমি, বনাঞ্চল ও সড়কের পাশে সহজে দেখা মিলত ভেষজ উদ্ভিদ সাদা মটমটিয়ার। নানা রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে লোকজ ও ভেষজ চিকিৎসায় এই উদ্ভিদটির এক সময় ছিল ব্যাপক ব্যবহার।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসার প্রসার, ঝোপঝাড় পরিষ্কার, বনাঞ্চল উজাড়, বসতবাড়ির পরিধি বৃদ্ধি, আর ভেষজ উদ্ভিদের প্রতি উদাসীনতায় কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই উপকারী উদ্ভিদটি।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও ভেষজ চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, সাদা মটমটিয়া একটি পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ। গ্রামীণ এলাকায় এক সময় এই উদ্ভিদটি বিভিন্ন রোগের ঘরোয়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো। বিশেষ করে এর পাতা ও ফুল জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং হজমের সমস্যা দূর করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে এবং লিভারের কার্যকারিতা উন্নত করে।
এ ছাড়া ভেষজ গুণে সমৃদ্ধ সাদা মটমটিয়ার পাতার রস কৃমিনাশক হিসেবে কার্যকর বলে প্রচলিত রয়েছে। দাদ, খোসপাঁচড়া, ব্রণ ও ক্ষতস্থানে এর পাতা থেঁতো করে লাগালে উপকার পাওয়া যায় বলে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের বিশ্বাস। বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড় বা ছোটখাটো কাঁটাছেঁড়াতেও এর ব্যবহার রয়েছে। এ ছাড়াও আরও নানা রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে এ উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাদা মটমটিয়া একটি ঝোপাল ঔষধি উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম লিপিয়া আলবা। এটির ইংরেজি নাম বুশি ম্যাটগ্রাস বা বুশি লিপিয়া। এই উদ্ভিদটি ভারবেনাসি পরিবারের একটি ছোট আকারের উদ্ভিদ। এ উদ্ভিদের ফুল দেখতে বেশ সুন্দর। সাধারণত এদের কান্ডের ভাঁজে ফুল ফোটে। এরা পতিত জমি, সড়কের পাশে, বিভিন্ন জলাশয় পারে, বনাঞ্চলে ও পরিত্যক্ত স্থানে এমনিতেই জন্মে।
উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের নাল্লা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল লতিফ (৭৪) বলেন, আগে গ্রামের মেঠো পথ, ডোবা কিংবা ঝোপে প্রচুর সাদা মটমটিয়া গাছ দেখা যেত। ছোটবেলায় পেট ব্যথা বা কৃমি হলে আমাদের মায়েরা এর পাতার রস খাওয়াতেন। এ ছাড়াও আরও নানা অসুখে এর পাতা ও ফুলের রস খাওয়াতেন। এতে আমাদের অসুখ সেরে যেত। তবে এখন তো এই গাছ তেমন একটা খুঁজেই পাওয়া যায় না।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীর্ঘভূমি এলাকার প্রবীন বাসিন্দা আশরাফ আলী (৭৯) বলেন, আমাদের কিশোর বয়সে ছোটখাটো কেটে গেলে মোটামুটি আর কষ লাগাতাম, এতে রক্ত বন্ধ হয়ে যেত এবং ক্ষতস্থান কম সময়ে ভালো হয়ে যেত। ছোটবেলায় দেখেছি, এই গাছসহ আরও নানারকমের গাছ আমাদের মা-চাচিরা নানা রোগে ব্যবহার করতেন। বর্তমান সময়ে মানুষ এসব ভেষজ গাছ ভুলে যাচ্ছে।
অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, গাছগাছালি আমাদের জন্য বড় নেয়ামত। প্রকৃতিতে জন্মানো অধিকাংশ গাছই ভেষজ গুণ সমৃদ্ধ। গ্রামীণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের সঙ্গে অনেক ভেষজ উদ্ভিদ জড়িয়ে আছে। এরা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে প্রকৃতি থেকে অনেক উপকারী উদ্ভিদ হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের স্থানীয় ভেষজ উদ্ভিদ সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার (ইউনানি) মোহাম্মদ সোহেল রানা কালবেলাকে বলেন, সাদা মটমটিয়া একটি পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদ। এ উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ নানা রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এই উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের অসচেতনতায় এ ধরনের উপকারী ভেষজ উদ্ভিদ প্রকৃতি থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসা এসব ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। না হলে গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এক সময় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে।