1. faysal.rakib2020@gmail.com : admin :
  2. thelabpoint2022@gmail.com : Rifat Hossain : Rifat Hossain
দত্তক নেওয়ার ১৫ বছর পর মেয়েকে অস্বীকার মায়ের - বাংলার কন্ঠস্বর ।। Banglar Konthosor
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২:২০ অপরাহ্ন
নোটিশ :
বিভিন্ন জেলা,উপজেলা-থানা,পৈারসভা,কলেজ পর্যায় সংবাদকর্মী আবশ্যক । 01711073884

দত্তক নেওয়ার ১৫ বছর পর মেয়েকে অস্বীকার মায়ের

  • প্রকাশিত : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
  • ৭৫ 0 বার সংবাদি দেখেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

শৈশব থেকেই যাদের মা-বাবা জেনে এক ছাদের নিচে বড় হয়েছেন, হঠাৎ এক দিন জানতে পারেন তারা তার জৈবিক বাবা-মা নন। এরপর তার অজান্তেই বদলে ফেলা হয় জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ ও সরকারি কাগজপত্রে থাকা দত্তক বাবা-মায়ের নাম। তারপর একসময় বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। নিজের শেকড়, আত্মপরিচয়ের সন্ধানে বর্তমানে এক অনিশ্চিত জীবন পার করছেন ক্লাউডিয়া চৌধুরী। তার একটাই প্রশ্ন—আমি আসলে কে?

 

জন্মের পর থেকেই ডা. শিপ্রাকে মা এবং ডা. ওবায়দুরকে বাবা হিসেবেই জেনে বড় হয়েছেন ক্লাউডিয়া। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ জুন হঠাৎই যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তাকে জানানো হয়, তিনি শিপ্রা চৌধুরীর গর্ভজাত সন্তান নন। এরপর এক কাপড়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, কৌশলে ক্লাউডিয়ার একাডেমিক সনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে বাবা-মা হিসেবে থাকা ডা. শিপ্রা চৌধুরী ও ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরীর নামও পরিবর্তন করা হয়।

 

এমনকি মেয়ের নামে হেবা দলিলে দেওয়া ৫ কাঠা জমি ফেরত নিতেও মামলা করা হয়েছে। এভাবেই জন্মের ১৮ বছর পর নিজের ‘আসল’ বাবা-মাকে খুঁজে ফিরছেন ক্লাউডিয়া চৌধুরী। রাজশাহীর আলোচিত এ ঘটনার নেপথ্যে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও উত্তরাধিকার সম্পত্তির বিষয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

 

ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার শিপ্রা চৌধুরী ও প্রয়াত ডাক্তার ওবায়দুর রহমান চৌধুরীকেই নিজের মা-বাবা হিসেবে জেনে বড় হয়েছেন ক্লাউডিয়া। তাদের পরিবারেই তার বেড়ে ওঠা, সেখানেই লেখাপড়া, সেখানেই জীবনের স্বপ্ন বোনা। কিন্তু ২০২৩ সালে আচমকাই তার জীবনের ভিত্তিটাই যেন ভেঙে পড়ে। ক্লাউডিয়ার ভাষ্যমতে, এক দিন তাকে জানানো হয়, তিনি এ পরিবারের জৈবিক সন্তান নন, দত্তক নেওয়া সন্তান। সেইসঙ্গে তার অজান্তেই বদলে ফেলা হয় জন্মনিবন্ধন, জেএসসি, এসএসসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিতে থাকা বাবা-মায়ের নাম। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, যাদের নাম নতুন করে তার পরিচয়ে যুক্ত করা হয়েছে, তাদের তিনি কখনো চিনতেনই না।

 

এমনকি তাদের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা যোগাযোগের কোনো তথ্যও তাকে দেওয়া হয়নি। ক্লাউডিয়া বলেন, আমি যখন জানতে চাইলাম আমার আসল পরিচয় কী, তখন আমাকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বরং বাসা থেকেই বের করে দেওয়া হয়। এখন আমি জানি না কাকে আমার বাবা-মা হিসেবে পরিচয় দেব।

 

তার অভিযোগ, বিভিন্ন সময় চাপ প্রয়োগ করে তাকে কাগজপত্র ও এফিডেভিটে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। এমনকি তার নামে থাকা জমি নিয়েও পরে বিরোধ সৃষ্টি হয়।পরিচয় পরিবর্তনের পর কলেজে ভর্তি ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে গিয়ে একের পর এক জটিলতায় পড়তে হয় ক্লাউডিয়াকে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পাওয়ায় তার শিক্ষাজীবনের একটি বছরও নষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।

 

বর্তমানে নিজেকে অসহায়, নিপীড়িত ও পরিচয় সংকটে ভুগছেন উল্লেখ করে ক্লাউডিয়া বলেন, আমি শুধু জানতে চাই কেন আমার পরিচয় বদলে দেওয়া হলো? কেন আমাকে এতদিনের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো?

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ডা. শিপ্রা চৌধুরী ক্লাউডিয়া চৌধুরীর বাবা-মায়ের নাম সংশোধন বা পরিবর্তনের জন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে আবেদন করেন। ওইদিনই তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর এস এম মাহবুবুল হক পাভেল সেটির অনুমোদন দিয়ে প্রত্যয়ন দেন। এর তিন দিন আগে, ৪ জানুয়ারি, শিপ্রা চৌধুরী কৌশলে ক্লাউডিয়ার বাবা মো. বাবুল ও মা মোসা. টগরী বেগমের নাম উল্লেখ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরযুক্ত একটি নাগরিক ও চারিত্রিক সনদপত্র ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে জমা দেন।

 

এভাবেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে জন্মনিবন্ধন থেকে ডা. শিপ্রা চৌধুরী ও তার স্বামীর নাম বাদ দেওয়া হয়। পরে ধীরে ধীরে ক্লাউডিয়ার সব একাডেমিক কাগজপত্রেও বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করা হয়। তবে পরিবর্তিত জন্মসনদে ক্লাউডিয়ার মায়ের নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মোসা. টগরী বেগমের নাম। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই টগরী বেগমও ক্লাউডিয়ার জৈবিক মা নন। গত ২১ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের গঙ্গারামপুর গ্রামে গিয়ে টগরী বেগমের সঙ্গে কথা হয়।

 

তিনি বলেন, ক্লাউডিয়া আমার গর্ভের সন্তান নয়। আমার নাম ব্যবহার করে ডা. শিপ্রা চৌধুরী প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। ক্লাউডিয়ার ফুফা মো. আরশাদ আলী জানান, ছোটবেলায় শিশুটিকে এমন শর্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে, তার জৈবিক পরিবার আর কখনো তার পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না কিংবা যোগাযোগও রাখতে পারবে না।

 

তিনি বলেন, গরিব পরিবার হওয়ায় মেয়েটিকে ভালোভাবে মানুষ করার আশ্বাস দিয়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

 

ক্লাউডিয়ার জৈবিক বাবা হিসেবে পরিচয় পাওয়া মো. বাবুল বলেন, ২০০৮ সালে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের দিয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়েছিল, যেখানে উল্লেখ ছিল তারা ভবিষ্যতে মেয়ের ওপর কোনো দাবি করতে পারবেন না। তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ, লেখাপড়া জানি না। পরে শুনলাম মেয়ের সব কাগজপত্রে আমাদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেয়ে তো আমাকে চেনেই না, বাবা হিসেবেও মানতে পারবে না।

 

তিনি বলেন, আমার মেয়ের বয়স যখন ১১ মাস, তখন তাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর অনেক বছর ধরে তার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। আমি তাকে দেখিনি, সে-ও আমাকে কখনো দেখেনি। এখন হঠাৎ করে বলা হচ্ছে, ‘তুমি এসে তোমার মেয়েকে নিয়ে যাও।’

 

আমি মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি; কিন্তু সে আমাকে বাবা হিসেবে চেনে না, কথা বলতেও আগ্রহ দেখায় না। আমার বর্তমান সংসারে ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে তারা আমার মেয়েকে কীভাবে গ্রহণ করবে, সেটি নিয়ে আমি গভীর উদ্বেগে আছি। একই সঙ্গে আশঙ্কা করছি, আমার মেয়েও হয়তো কোনোদিন আমাকে তার বাবা হিসেবে মেনে নিতে পারবে না।

 

বাবুল আরও বলেন, দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার কারণে আমি এক কঠিন মানসিক সংকটের মধ্যে আছি। এ পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নেব, সেটিই বুঝে উঠতে পারছি না।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাহামুদুল হক হায়দারী বলেন, ‘অনেক বছর আগেই তৎকালীন চেয়ারম্যানের মাধ্যমে শিশুটিকে দত্তক নেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে শিশুটি তাদের কাছেই লালিত-পালিত হয়েছে। পরে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তারা আমার কাছে একটি প্রত্যয়নপত্র চেয়েছিলেন। যাচাই-বাছাই করে আমরা সেটি দিয়েছিলাম। এরপর সেই প্রত্যয়ন ব্যবহার করে তারা কী করেছেন, সে বিষয়ে আমি অবগত নই।’ তিনি আরও বলেন, শুনেছি জন্মনিবন্ধনের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

 

কেন এই পরিবর্তন করা হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকেই সঠিক তথ্য জানা যাবে। আমার জানা মতে, শিশুটিকে কোনো দাবিদাওয়া ছাড়াই তাদের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং এরপর থেকে তার লালন-পালনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাদেরই ছিল। কীভাবে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করা হলো—জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ২০০৮ সালে ক্লাউডিয়া চৌধুরী পায়েলের জন্মনিবন্ধনের জন্য ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরী ও ডা. শিপ্রা চৌধুরী নিজেদের বাবা-মায়ে পরিচয়ে আবেদন করেছিলেন।

 

তাদের স্বাক্ষরের ভিত্তিতেই জন্মনিবন্ধন করা হয়। তবে ২০২৩ সালে ডা. শিপ্রা চৌধুরী ফের এসে জানান, ক্লাউডিয়া তাদের জৈবিক সন্তান নন; তিনি দত্তক সন্তান ছিলেন। এরপর জন্মনিবন্ধনে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তনের আবেদন করা হয়। ওয়ার্ড সচিবের ভাষায়, আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম। কারণ একজন মানুষের বাবা-মা তো একজনই হয়। কিন্তু পরে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অনুমোদনের পর নতুন নাম সংযুক্ত করে জন্মনিবন্ধন ইস্যু করা হয়।

 

রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আলী আশরাফ মাসুম বলেন, জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পরিবর্তনের নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়। তিনি বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমেই হবে। তবে মানবিকভাবে বিষয়টির সমাধান হওয়া জরুরি। সার্বিক বিষয়ে জানতে গত ২০ মে নগরীর পদ্মা ক্লিনিকে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে যান এ প্রতিবেদক।

কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং প্রতিবেদককে ‘স্টপ’ বলে রূঢ় আচরণ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে চান না। এর কিছুক্ষণ পর অস্ট্রেলিয়া থেকে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর পুত্রবধূ শাম্মি আক্তার চৌধুরী মোবাইল ফোনে কল করে জানতে চান, কেন ডা. শিপ্রা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল।

 

ক্লাউডিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার শাশুড়ির একটি মাত্র ছেলে দেশের বাইরে থাকে। তার বয়স এখন ৬০ বছরের বেশি। স্বাভাবিকভাবেই তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এজন্যই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।’

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Comments are closed.

‍এই ক্যাটাগরির ‍আরো সংবাদ
Theme Customized By BreakingNews