
নিজস্ব প্রতিবেদক // পটুয়াখালীর দুমকীতে পায়রা নদীতে প্রশাসনের অভিযান চলছে, চলছে মা-ইলিশ নিধনও। একদিকে অভিযানের ট্রলার দেখলেই জাল গুটিয়ে পালাচ্ছেন জেলেরা, অন্যদিকে টহলদল সরে যেতেই আবার নামছে মাছ ধরার নৌকা। নদীর এক প্রান্তে অভিযান, অন্য প্রান্তে অবাধে ইলিশ শিকার। প্রশাসনের সঙ্গে জেলেদের এই চোর-পুলিশ খেলায় কার্যত ভেস্তে যেতে বসেছে মা-ইলিশ রক্ষার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) পর্যন্ত চলমান অভিযানে ২৬ হাজার মিটার অবৈধ জাল ও তিনটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা জব্দ করেছে প্রশাসন। জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হলেও বন্ধ করা যাচ্ছে না নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ আহরণ। জনবলসংকট, একটি মাত্র টহল দল ও নদীপথে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে পায়রা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দিন-রাত চলছে মা-ইলিশ শিকার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার পাঙ্গাশিয়া, আলগী, লেবুখালী, আঙ্গারিয়া ও মুরাদিয়াসহ পায়রা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জাল ফেলছেন একশ্রেণির জেলে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক ব্যক্তিদেরও মাছ ধরতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি জেলেদের পরিবারের নারী সদস্যরা নদীর তীরে অবস্থান করে প্রশাসনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অভিযানের ট্রলার দূরে দেখা গেলেই মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পৌঁছে যায় নদীতে থাকা জেলেদের কাছে। খবর পেয়েই তারা জাল ফেলে দ্রুত তীরে উঠে আত্মগোপন করেন। টহলদল চলে গেলে আবার নদীতে নেমে জাল তুলে মাছ সংগ্রহ করেন। কখনো একদল জেলে প্রশাসনের ধাওয়া খেয়ে পালালেও অন্যদল সুযোগ বুঝে নদীর অন্য প্রান্তে জাল ফেলেন। ফলে অভিযান চললেও নদীজুড়ে নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ শিকার বন্ধ হচ্ছে না।
পাঙ্গাশিয়ার বাসিন্দা মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রশাসন নদীর একদিকে অভিযান চালালে অন্যদিকে জেলেরা মাছ ধরছেন। টহল শেষ হলেই আবার শুরু হয় মাছ শিকার। এভাবে চলতে থাকলে মা-ইলিশ রক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, নদীর গুরুত্বপূর্ণ সব পয়েন্টে একযোগে অভিযান চালানো প্রয়োজন।’
Ad
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের টহল দল একটু আগেই ওই এলাকা থেকে ঘুরে এসেছে। জনবল কম এবং একটি মাত্র টহল দল থাকায় নদীর সব জায়গায় সমানভাবে নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে আমরা টহল দল বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’
উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলমান অভিযানে এ পর্যন্ত ২৬ হাজার মিটার অবৈধ জাল ও তিনটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা জাল প্রকাশ্যে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও দ্রুতগতির নৌযানের অভাবে নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ফলে নজরদারির ফাঁক গলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার সুযোগ পাচ্ছেন জেলেরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু জাল ও নৌকা জব্দ করে মা-ইলিশ নিধন বন্ধ করা সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে একাধিক টহল দল মোতায়েন, দিন-রাত সমন্বিত অভিযান এবং অবৈধভাবে আহরিত ইলিশের মজুত ও বিপণন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
প্রসঙ্গত, ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু অভিযান, জাল জব্দ ও নৌকা আটকানোর পরও দুমকির পায়রা নদীতে মা-ইলিশ শিকার বন্ধ না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় সচেতন মহলে। তাদের দাবি, নদীর এক প্রান্তে অভিযান আর অন্য প্রান্তে মাছ শিকারের এই চোর-পুলিশ খেলা বন্ধ করতে নজরদারি জোরদার ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় মা-ইলিশ রক্ষায় সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।