বরিশাল বিভাগের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র ঝালকাঠির ভীমরুলি ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগানে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে পৃথক দুই দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, কার্যকর তদারকি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারির অভাবের কারণেই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
বর্ষা মৌসুমে ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের বিস্তীর্ণ পেয়ারা বাগান দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। খালজুড়ে ভাসমান পেয়ারা বাগানের মনোরম সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় করেন। শুধু পর্যটন নয়, এ অঞ্চল দেশের অন্যতম বৃহৎ পেয়ারা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। এখানকার উৎপাদিত পেয়ারা নৌপথ ও সড়কপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
গত ১৮ জুলাই ঝালকাঠির ভীমরুলি ভাসমান হাট সংলগ্ন পেয়ারা বাগানে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে এসে গোসলের সময় খালে ডুবে মারা যায় স্কুলছাত্র মোঃ সানি (১৩)। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, খালের পাড়ে থাকা একটি আমগাছ থেকে পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করে।
এরপর পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে ট্রলারে ভ্রমণের সময় চলন্ত ট্রলার থেকে গভীর পানিতে পড়ে প্রাণ হারায় এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মুহিন সরদার (১৭)। অনেক চেষ্টা করেও তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার পর্যটক এসব পেয়ারা বাগানে ভ্রমণে এলেও খালপথে চলাচলকারী ট্রলারের নিরাপত্তা, লাইফ জ্যাকেটের বাধ্যতামূলক ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয় না। অনেক ট্রলারে উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্সে গান বাজানো, ডিজে পার্টি, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং নানা ধরনের বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারির অভাবে পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
তবে সচেতন মহলের মতে, জনপ্রিয় এ পর্যটন এলাকায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধ করা, ডিজে পার্টি ও উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত কর্মী মোতায়েন এবং নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ তদারকি নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করছেন।
দুদিনে দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই পর্যটন ও কৃষিভিত্তিক অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার, পর্যটকদের জন্য সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) খলিল আহমেদ বলেন, “বিষয়টি আমি শুনেছি। পেয়ারা বাগানে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকেও নজরদারি বাড়ানো হবে। বিষয়টি নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। আমি এ বিষয়ে ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলছি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।”