
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট প্রতিনিধি।।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি নদী, পলি, জোয়ার-ভাটা, লোনা জল, বৃক্ষ, বন্যপ্রাণী ও মানুষের দীর্ঘ সহাবস্থানের এক অনন্য জীবন্ত ইতিহাস। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই অরণ্য পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি হিসেবে পরিচিত।
সুন্দরবনের বুক চিরে বয়ে গেছে অসংখ্য নদী ও খাল। জোয়ারের লবণাক্ত পানি প্রতিনিয়ত বদলে দেয় মাটি ও জীবনের রসায়ন। সেই পরিবর্তনশীল পরিবেশে টিকে আছে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া, বাইনসহ নানা লবণসহিষ্ণু উদ্ভিদ। একই সঙ্গে এ বন হয়ে উঠেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, বানর, বন্য শূকর, কাঁকড়াসহ অসংখ্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল।
সুন্দরবনের ইতিহাস তাই কেবল একটি অরণ্যের ইতিহাস নয়। এটি নদী ও বদ্বীপের ইতিহাস, জনপদ ও বাণিজ্যের ইতিহাস এবং প্রকৃতিনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকার ইতিহাস।
‘সুন্দরবন’ নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, এই বনে ব্যাপকভাবে জন্মানো ‘সুন্দরী’ গাছ থেকেই ‘সুন্দরবন’ নামের উৎপত্তি।
সুন্দরী সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষ। লবণাক্ততা ও জোয়ার-ভাটাপ্রবণ পরিবেশে টিকে থাকার অসাধারণ সক্ষমতার কারণে এটি সুন্দরবনের উদ্ভিদজগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে নামের উৎপত্তি নিয়ে ‘সমুদ্রবন’ বা স্থানীয় ভূখণ্ড ও জনপদের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কিছু মতও প্রচলিত রয়েছে। ঐতিহাসিক ও গবেষণামূলক অনুসন্ধানে এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সুন্দরী বৃক্ষের সঙ্গে ‘সুন্দরবন’ নামের সম্পর্কই সবচেয়ে পরিচিত ব্যাখ্যা।
সুন্দরবনের সৃষ্টি বুঝতে হলে বুঝতে হবে বদ্বীপের গঠনপ্রক্রিয়া। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রসহ বৃহৎ নদ-নদী বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে দক্ষিণে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে সেই পলি নদীর মোহনা ও উপকূলীয় অঞ্চলে জমে তৈরি করেছে নতুন ভূমি।
একদিকে মিষ্টি পানির প্রবাহ, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত জল—দুইয়ের মিলনে তৈরি হয়েছে অনন্য এক পরিবেশ। প্রতিদিনের জোয়ার-ভাটায় বদলে যায় পানির উচ্চতা, লবণাক্ততা ও মাটির বৈশিষ্ট্য।
এই পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ। শ্বাসমূল, লবণ সহনশীলতা ও জোয়ারের পানিতে টিকে থাকার সক্ষমতা সুন্দরবনকে করেছে পৃথিবীর অন্যতম অনন্য প্রতিবেশব্যবস্থা।
সুন্দরবনের অস্তিত্বের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। অসংখ্য নদী ও খাল অরণ্যের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। এসব জলধারা বহন করে পলি, পুষ্টি ও জীবনের নানা উপাদান।
বলেশ্বর, শিবসা, পশুর, কপোতাক্ষ, রায়মঙ্গল, কালিন্দী, খোলপেটুয়া, হরিণঘাটা, ভদ্রা, কুঙ্গা, কাজীবাছা, চুনকুড়ি ও শাকবাড়িয়াসহ অসংখ্য নদী ও জলধারা সুন্দরবনের জীবনপ্রবাহের অংশ।
নদী-খালগুলো মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একই সঙ্গে এসব নদী-নির্ভর এলাকার জেলে, নৌযানচালক, ব্যবসায়ীসহ অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকাও সুন্দরবনের সঙ্গে যুক্ত।
সুন্দরবনসংলগ্ন নদীগুলোর মধ্যে বলেশ্বর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। বাগেরহাটের পূর্বাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত এ নদী শরণখোলাসহ আশপাশের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
জেলে, কৃষক, নৌযানচালক ও ব্যবসায়ী—বহু মানুষ নদীটির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষায় ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উপস্থিতি নদীটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে নদী যেমন জীবন ও জীবিকা দেয়, তেমনি জোয়ার, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও প্রবল স্রোতের কারণে কখনো কখনো উপকূলীয় মানুষের জন্য সংকটও তৈরি করে।
শিবসা সুন্দরবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী। বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা ও ছোট নদীর পানি ধারণ করে এটি দক্ষিণে এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে পশুর নদী সুন্দরবনের জলপ্রবাহের পাশাপাশি নৌ-যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নদীগুলোর গতিপথ শুধু ভূগোল তৈরি করেনি; এগুলোর তীরে গড়ে উঠেছে জনপদ, বাজার, বন্দর ও মানুষের জীবিকা।
বঙ্গীয় বদ্বীপে নদীর গতিপথ পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কোথাও নদী ভরাট হয়েছে, কোথাও নতুন প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে। নদীর গতিপথের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে মানুষের বসতি, কৃষি, বন্দর ও বাণিজ্যের কেন্দ্র।
নদীর পলি যেমন নতুন ভূমি তৈরি করেছে, তেমনি নদীভাঙন ধ্বংস করেছে পুরোনো জনপদ। ফলে নদী ও মানুষের সম্পর্ক একই সঙ্গে নির্মাণ ও ধ্বংসের।
সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও এই সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
বর্তমানে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা গভীর বনভূমি হলেও ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এর কিছু অংশে মানুষের বসতি ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অস্তিত্বের কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
পুরোনো মানচিত্র ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় জনপদ ও বন্দর ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। নদী ও সমুদ্রপথের কারণে এ অঞ্চল অতীতে বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে ধারণা করা হয়।
মাছ, বনজ সম্পদ ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনকে কেন্দ্র করে নদীপথে গড়ে উঠেছিল মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
সুন্দরবনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় প্রাচীন মানববসতির সম্ভাব্য নিদর্শনের বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পুরোনো স্থাপনা, মৃৎপাত্র কিংবা মানুষের ব্যবহার্য সামগ্রীর সন্ধান পাওয়ার দাবি গবেষকদের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
তবে এসব দাবির প্রত্নতাত্ত্বিক সত্যতা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। অতীতে সুন্দরবনের কোনো কোনো অংশে মানুষের বসতি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির উপস্থিতি ছিল কি না—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরও গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।
মানবসভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও জীবিকার জন্য সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। সময়ের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ মানুষের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে প্রকৃতির ওপর মানুষের চাপ।
বন উজাড়, নদী ও জলাভূমি দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং কার্বন নিঃসরণের মতো কর্মকাণ্ড বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিবেশব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সুন্দরবনও এই চাপ থেকে মুক্ত নয়।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং মিঠা পানির প্রবাহের পরিবর্তন সুন্দরবন ও আশপাশের জনপদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
অন্যদিকে সুন্দরবন নিজেই উপকূলীয় মানুষের জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বনভূমি ঢেউ ও বাতাসের শক্তি কমাতে ভূমিকা রাখে।
তাই সুন্দরবন রক্ষা শুধু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে উপকূলের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাও জড়িত।
সুন্দরবনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু পর্যটনে সীমাবদ্ধ নয়। জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল, কাঁকড়া সংগ্রহকারী, নৌযান শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির বনজীবী মানুষের জীবিকা এ অরণ্যের ওপর নির্ভরশীল।
একদিকে বনজ সম্পদ আহরণের ওপর মানুষের জীবিকা নির্ভর করে, অন্যদিকে অতিরিক্ত আহরণ বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ তৈরি করে। ফলে বড় প্রশ্ন হলো—মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করে কীভাবে বন সংরক্ষণ করা সম্ভব?
নিয়ন্ত্রিত আহরণ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, বিকল্প জীবিকা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নির্দিষ্ট সময়ে সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণ সীমিত বা বন্ধ রাখার ফলে বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীর ওপর মানুষের চাপ কমে। এ সময় প্রাণীরা তুলনামূলক নিরাপদে বিচরণ ও প্রজননের সুযোগ পায়।
নদী-খালেও মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজননের সুযোগ তৈরি হয়। এতে প্রমাণিত হয়, মানুষের চাপ কিছুটা কমানো গেলে প্রকৃতি নিজস্ব পুনরুদ্ধার ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে।
সুন্দরবনকে শুধু ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি জটিল ও জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা। একটি গাছ কাটা, একটি খাল ভরাট, কোনো প্রজননক্ষেত্র নষ্ট করা কিংবা বন্যপ্রাণী শিকার—প্রতিটি ঘটনাই বৃহত্তর খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নদীর প্রবাহ কমে গেলে, লবণাক্ততা অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে কিংবা অতিরিক্ত মাছ-কাঁকড়া আহরণ হলে সুন্দরবনের স্বাভাবিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হলে বাড়তে পারে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতও।
তাই সুন্দরবন রক্ষা শুধু বন বিভাগের একক দায়িত্ব নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বনজীবী, গবেষক, প্রশাসন, পরিবেশকর্মী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং রাষ্ট্র—সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নদীর পলি, সাগরের লোনা জল, জোয়ার-ভাটা ও জীববৈচিত্র্যের দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে সুন্দরবন। এটি শুধু একটি অরণ্য নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেশব্যবস্থা, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপকূলের মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ।
আজ সুন্দরবনের সামনে মূল প্রশ্ন—মানুষ কি এই বনকে শুধু ব্যবহার করবে, নাকি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পথ বেছে নেবে?
সুন্দরবন উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল, নদীর জীবনপ্রবাহ, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল। একই সঙ্গে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা।
সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখা তাই শুধু একটি বন রক্ষার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী, জীববৈচিত্র্য, বনজীবী মানুষের জীবিকা, উপকূলের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্ন।