
নিজস্ব প্রতিবেদক ::
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ২ নম্বর মগড় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান জামাল হোসেন মল্লিকের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভিজিডি-ভিজিএফ কার্যক্রম, নাগরিক সেবা প্রদান, সালিশ-মীমাংসা এবং বিভিন্ন সরকারি ভাতার সুবিধাভোগী তালিকা প্রণয়নকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়,একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বরিশালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলার ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি থাকার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইউনিয়নজুড়ে জনমনে আলোচনা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
তবে স্থানীয় অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জামাল হোসেন মল্লিক ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, তিনি তৎকালীন চেয়ারম্যান এনামুল হক শাহিনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ওই নির্বাচনে অনিয়মের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, সে সময় নির্বাচন নিয়ে ‘রাতের ভোট’-এর নানা অভিযোগ ও আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা প্রমাণের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান এনামুল হক শাহিন আত্মগোপনে চলে গেলে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জামাল হোসেন মল্লিককে প্যানেল চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, ইউপি সদস্য থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে প্যানেল চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম ও নাগরিক সেবা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এছাড়া আরো অভিযোগ রয়েছে, জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সেবা পেতে হয়রানি ও নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদে বিভিন্ন বিরোধের সালিশ-মীমাংসাকে কেন্দ্র করে কথিত ‘সালিশ বাণিজ্য’ চলার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন বিরোধের সালিশে পক্ষগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, রাস্তা সংস্কার, কালভার্ট নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের বরাদ্দের সঙ্গে বাস্তবে সম্পন্ন কাজের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ সম্পূর্ণ না করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয় জনসাধারণের।
এমনকি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাস্তবায়িত কিছু রাস্তা ও অবকাঠামো প্রকল্পের অনুরূপ প্রকল্প ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসূচির প্রথম পর্যায়সহ ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে একাধিক প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ ও অসম্পূর্ণ বাস্তবায়নের চিত্র দেখা গেছে।
এদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ বিভিন্ন সরকারি ভাতা এবং ভিজিডি-ভিজিএফ কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী বা সুপারিশভিত্তিক ব্যক্তিদের সুবিধাভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীর তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও কোথাও কোথাও টাকা দাবি করা হয়। অর্থ না দিলে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।
এছাড়া ভিজিএফ কর্মসূচির চাল বিতরণে বরাদ্দের তুলনায় কম চাল বিতরণ, জালিয়াতি এবং সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। একই ধরনের অনিয়ম ভিজিডি কর্মসূচিতেও হয়েছে বলে দাবি তাদের।
অভিযোগের বিষয়ে মগড় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান জামাল হোসেন মল্লিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে নলছিটি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ আওলাদ হোসেন বলেন, কোনো প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ বা বরাদ্দের অপব্যবহারের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেলে খোঁজ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।